বিদ্যুৎ যাওয়ার চেয়ে ফিরে আসার মুহূর্তটাই যন্ত্রপাতির জন্য বেশি বিপজ্জনক – হঠাৎ ভোল্টেজ স্পাইকে এসির পিসিবি, ফ্রিজের কম্প্রেসর আর টিভির পাওয়ার বোর্ড যায়। কী করলে যন্ত্র বাঁচে, পরিবার নিরাপদ থাকে, আর কোন লক্ষণ দেখলে দেরি না করে ইলেকট্রিশিয়ান ডাকবেন – এই গাইডে।
কেন লোডশেডিং যন্ত্রপাতির শত্রু
বিদ্যুৎ চলে গেলে সমস্যা নয় – সমস্যা ফিরে আসার সময়। লাইনে হঠাৎ চাপ পড়ে ভোল্টেজ কয়েক সেকেন্ডের জন্য অনেক ওপরে বা নিচে চলে যায় (স্পাইক/ব্রাউনআউট)। কম ভোল্টেজে মোটর (ফ্রিজ, এসি, পাম্প) বেশি কারেন্ট টেনে গরম হয়; বেশি ভোল্টেজে ইলেকট্রনিক বোর্ড (ইনভার্টার এসি, টিভি, রাউটার, চার্জার) পুড়ে যায়। ঢাকায় ইনভার্টার এসির পিসিবি আর ফ্রিজের রিলে নষ্ট হওয়ার একটা বড় কারণ এটাই।
দ্বিতীয় বিপদ: বিদ্যুৎ যাওয়ার মুহূর্তে কম্প্রেসর মাঝপথে থেমে যায়, আর সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এলে চাপের বিপরীতে স্টার্ট নিতে গিয়ে ওভারলোড ট্রিপ করে বা ওয়াইন্ডিং পোড়ে। এ কারণেই “৩–৫ মিনিট পর চালু” নিয়মটা এত জরুরি।
বিদ্যুৎ গেলে ও এলে – ১০টি নিয়ম
- বিদ্যুৎ যাওয়ামাত্র এসি, ফ্রিজ (সম্ভব হলে), টিভি ও কম্পিউটারের সুইচ বন্ধ করুন – ফিরে আসার স্পাইক তাহলে যন্ত্রে পৌঁছায় না।
- বিদ্যুৎ এলে ৩–৫ মিনিট অপেক্ষা করুন, ভোল্টেজ স্থির হোক; তারপর একটা একটা করে চালু করুন, সব একসঙ্গে নয়।
- ফ্রিজ ও এসিতে ভালো মানের অটোমেটিক স্টেবিলাইজার (টাইম ডিলে সহ) লাগান – এটি নিজেই কয়েক মিনিট দেরি করে চালু করে।
- টিভি, রাউটার, কম্পিউটার, চার্জার – সার্জ প্রোটেক্টর মাল্টিপ্লাগে চালান; সস্তা মাল্টিপ্লাগ সার্জ আটকায় না।
- মোমবাতি নয়, রিচার্জেবল লাইট বা টর্চ ব্যবহার করুন – বাংলাদেশে লোডশেডিংয়ের আগুনের বড় অংশ মোমবাতি থেকে।
- জেনারেটর কখনো ঘরের ভেতরে বা বন্ধ বারান্দায় চালাবেন না – কার্বন মনোক্সাইড নিঃশব্দে প্রাণ নেয়।
- আইপিএস/ইউপিএস-এর ব্যাটারি খোলা জায়গায় রাখুন, শিশুর নাগালের বাইরে; পানি লাগবে এমন জায়গায় নয়।
- জেনারেটর বা আইপিএস লাইনে মেইন লাইন মেশাবেন না – চেঞ্জওভার সুইচ ইলেকট্রিশিয়ান দিয়ে লাগান, নইলে লাইনম্যানের জীবনের ঝুঁকি।
- অন্ধকারে ভেজা হাতে সুইচ বা প্লাগ ধরবেন না; গিজার ও ওয়াশিং মেশিনের প্লাগে বিশেষ সাবধান।
- ব্রেকার বারবার ট্রিপ করলে বারবার তুলে দেবেন না – কারণ আছে; ইলেকট্রিশিয়ান ডাকুন।
স্টেবিলাইজার, সার্জ প্রোটেক্টর, আইপিএস – কোনটা কখন
তিনটি তিন কাজের। স্টেবিলাইজার ভোল্টেজ কম-বেশি হলে ঠিক করে যন্ত্রে দেয় – মোটরওয়ালা যন্ত্রের (ফ্রিজ, এসি, পাম্প, ওয়াশিং মেশিন) জন্য; এসির টনের সঙ্গে মিলিয়ে ক্ষমতা (kVA) কিনুন। সার্জ প্রোটেক্টর ক্ষণিকের স্পাইক শুষে নেয় – ইলেকট্রনিক্সের (টিভি, কম্পিউটার, রাউটার) জন্য; কয়েক বছরে ক্ষয় হয়, ইন্ডিকেটর নিভে গেলে বদলান। আইপিএস/ইউপিএস বিদ্যুৎ গেলে ব্যাটারি থেকে চালায় – ফ্যান, লাইট, রাউটার, কম্পিউটারের জন্য; ফ্রিজ বা এসি সাধারণ আইপিএসে চলে না।
ইনভার্টার এসিতে অনেকে ভাবেন স্টেবিলাইজার লাগে না – ভোল্টেজ রেঞ্জ বড় হলেও স্পাইক থেকে বাঁচতে অন্তত সার্জ প্রোটেকশন দরকার; কারিগরকে জিজ্ঞেস করুন আপনার মডেলে কী দরকার।
যে লক্ষণে দেরি না করে ইলেকট্রিশিয়ান ডাকবেন
- সুইচবোর্ড, প্লাগ বা তার গরম, কালচে দাগ, পোড়া গন্ধ বা প্লাস্টিক গলার গন্ধ
- সুইচ দিলে স্পার্ক, বা সকেটে প্লাগ ঢুকালে টক-টক শব্দ
- লাইট ঘন ঘন ডিম হয়ে যায় বা ফ্যান চালালে লাইট কমে (ঢিলা নিউট্রাল/আর্থিং সমস্যা)
- ব্রেকার বা ফিউজ বারবার ট্রিপ করে
- ফ্রিজ, গিজার বা কলের পানিতে হাত দিলে হালকা শক – আর্থিং নেই, এটা জরুরি
- পুরোনো বাসায় কাপড় মোড়ানো তার, জোড়া দেওয়া তার, বা ফ্যানের রেগুলেটরে গরম
ইলেকট্রিশিয়ান ডাকার সময়
আমার কারিগর অ্যাপে “ইলেকট্রিক” ক্যাটাগরিতে কাছের ইলেকট্রিশিয়ানদের দেখুন – Verified ব্যাজ (বাসায় ঢোকার কাজে জরুরি), রেটিং, দক্ষতা ট্যাগ (ওয়্যারিং, আইপিএস/ইউপিএস, জেনারেটর, গিজার)। চ্যাটে লক্ষণ ও ছবি পাঠান – পোড়া দাগের ছবি দেখলে অভিজ্ঞ ইলেকট্রিশিয়ান আগেই বুঝে যান কী নিয়ে আসতে হবে। প্রোফাইলে ভিজিট ফি আর “সাধারণত কত খরচ হয়” দেখে তুলনা করুন।
আর্থিং, ব্রেকার (MCB/RCCB) আর ওয়্যারিং পরীক্ষা – এই তিনটি কাজ বছরে একবার করালে লোডশেডিংয়ের ক্ষতি অনেকটা কমে। RCCB (আর্থ লিকেজ ব্রেকার) না থাকলে লাগানোর কথা জিজ্ঞেস করুন – শক থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর যন্ত্র।
- বিদ্যুৎ গেলে সুইচ বন্ধ, এলে ৩–৫ মিনিট পর একটা একটা করে চালু।
- ফ্রিজ-এসিতে টাইম-ডিলে স্টেবিলাইজার; টিভি-রাউটারে সার্জ প্রোটেক্টর; আইপিএস শুধু ফ্যান-লাইটে।
- মোমবাতি নয়, রিচার্জেবল লাইট; জেনারেটর কখনো ঘরের ভেতরে নয়।
- গরম তার, পোড়া গন্ধ, শক, বারবার ট্রিপ – দেরি না করে ইলেকট্রিশিয়ান।
- বছরে একবার আর্থিং, ব্রেকার ও ওয়্যারিং চেক; RCCB না থাকলে লাগান।